মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০৩:৪৫ পূর্বাহ্ন
“বিশ্বের সবচেয়ে দামি আম ‘মিয়াজাকি’, যার দাম শুনলে চোখ ছানাবড়া”
অনলাইন ডেস্ক
২০১৬ সালে এক জোড়া আম বিক্রি হয়েছিল জাপানের ফুকুয়ামায় পাঁচ লাখ ইয়েনে, যা সেই সময় বাংলাদেশের মুদ্রায় প্রায় ৩ লাখ ৭০ হাজার টাকার কাছাকাছি। এরপর বছরগুলোতে এর দাম যেন চড়া পাহাড়ে আরোহনের মতোই বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৯ সালে দাম ছুঁয়েছিল চার লাখ টাকার গণ্ডি, আর ২০২৩ সালে এক কেজি ‘মিয়াজাকি’ আমের দাম সাড়ে চার লক্ষাধিক টাকায় ঠেকেছে। এমন চরম মূল্য নিয়ে এটি ফলের জগতে একেবারে ‘তারকা’। এর আসল নাম ‘তাইয়ো নো তামাগো’, ইংরেজিতে ‘এগ অব দ্য সান’ অর্থাৎ সূর্যডিম। গায়ের রং যেন উদীয়মান সূর্যের মতো টকটকে লাল আর আকৃতি ডিমের মতো—এই কারণেই এই খেতাব। তবে এর দাম কেন এত আকাশছোঁয়া? আসুন জানি এই আমের রহস্য।
বলা যায়, মিয়াজাকির দাম তার নামের ভারেই কিন্তু শেষ কথা নয়। এর গুণমান, স্বাদ ও উৎপাদন প্রক্রিয়া মিলিয়েই এটি অন্য আম থেকে আলাদা। সবচেয়ে আগে বলতে হয় এর চেহারা। এই আম চোখের জন্য এক প্রকার মিষ্টি দৃষ্টি; তার উজ্জ্বল লাল রং আর ডিমাকৃতির আকৃতি দেখলেই চোখ মুগ্ধ হয়। পরের দিকেই আসতে হয় স্বাদের কথায়। মিয়াজাকিতে থাকে ১৫ শতাংশ বা তার বেশি সুগার, যা এই আমকে অন্যসব আমের থেকে আলাদা করে। চিবোতেও অত্যন্ত নরম, তার আঁশ নেই বললেই চলে, ফলে দাঁতের ফাঁকে আঁশ আটকে যায় না। মুখে দেয় এক মধুর নরমাতন আর সাথে মিষ্টি ফুলের মতো হালকা ঘ্রাণ, যা প্রাকৃতিকভাবে পাকানোর কারণে সতেজ ও বিশুদ্ধ।
‘মিয়াজাকি’ নামের পেছনে রয়েছে এক দুরন্ত গবেষণা ও কঠোর চাষ পদ্ধতি। মূলত ‘আরউইন’ জাতের এই আমের উৎপত্তি যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা। ১৯৮০-এর দশকে জাপান এই আমের বীজ এনে পরীক্ষামূলকভাবে মিয়াজাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ও স্থানীয় কৃষকদের যৌথ প্রচেষ্টায় অনন্য ‘মিয়াজাকি’ প্রজাতি উদ্ভাবন করা হয়। জাপানের দক্ষিণে অবস্থিত মিয়াজাকি প্রদেশের উষ্ণ জলবায়ু, উর্বর মাটি এবং পর্যাপ্ত সূর্যালোক এই আম চাষের জন্য আদর্শ। তাই আমটির নামকরণ করা হয় এখানকার নামে।
চাষের প্রতিটি ধাপই অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত ও যত্নশীল। গ্রিনহাউসের নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে চারা লাগানো হয়, সার ও পানি দেওয়া হয় নিয়মিত, তাপমাত্রা ও বায়ুপ্রবাহ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয় যাতে আদ্রতা বাড়ে না। প্রতি গাছে একটিমাত্র আম রাখা হয় এবং মাঝে মাঝে আমের গায়ে ছোট ক্যামেরা লাগিয়ে সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানো হয়। গাছে ফল ফুটলে প্রায় ৮০ শতাংশ কুঁড়ি কেটে ফেলা হয় যাতে বাকি ফলগুলো পুষ্টিতে ভরপুর হয়। প্রতি আমকে ওজন ও আকৃতির ওপর ভিত্তি করে ঝুলিয়ে রাখা হয়, যেন ভালোভাবে পাকতে পারে। আমগুলো গাছে নিজে নিজে ছিঁড়ে না পড়লে ছেঁড়া হয় না—এর ফলে ফলের ক্ষতি কমে।
সব ‘মিয়াজাকি’ আমই দামি নয়, এই নাম পাওয়ার জন্য আমগুলোর কঠোর পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। মিয়াজাকি অ্যাগ্রিকালচারাল ইকোনমিক ফেডারেশন আমের গুণগত মান যাচাই করে। রং, ওজন ও সুগারের পরিমাণ এই পরীক্ষার মূল ভিত্তি। আমের রং কমপক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ লাল হতে হবে, এবং ওজন কমপক্ষে ৩৫০ গ্রাম হতে হবে। সুগার পরিমাণ অবশ্যই ১৫ শতাংশ বা তার বেশি থাকতে হবে। এই মানদণ্ড পূরণ করলে ‘তাইয়ো নো তামাগো’ খেতাব দেয়া হয়। মাত্র ১০ শতাংশ আম এই মর্যাদা পায়, আর এদের দামই আকাশছোঁয়া।
ভারত, বাংলাদেশসহ বিশ্বের নানা দেশে মিয়াজাকি আমের চাষ হলেও সেখানে দাম অনেক কম। ভারতে এক সময় কেজি দেড় থেকে দুই লাখ রুপিতে বিক্রি হলেও সাধারণত ১০০ থেকে ২০০ রুপি দরে পাওয়া যায়। বাংলাদেশে পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং ঢাকার কিছু এলাকায় চাষ হয়, যেখানে কেজিপ্রতি দাম দুই হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকার মধ্যে। এর কারণ, এখানকার আম মিয়াজাকির খেতাব পান না।
বিশ্বের সবচেয়ে দামি আম মিয়াজাকির রহস্য শুধু দাম নয়, এটি এক অনন্য গুণ ও যত্নের ফলস্বরূপ। এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, অতুলনীয় স্বাদ আর নিয়ন্ত্রিত চাষপদ্ধতি একসঙ্গে মিলে তৈরি করেছে এই আমকে ‘ফলের রাজার’ মর্যাদা।
সূত্র: জাপানিজ ফুড গাইড, টাইমস অব ইন্ডিয়া, ডেইলি স্টার